মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৬ অপরাহ্ন

আঁরার খাতুনগঞ্জ: কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যের এক মহাকাব্য

শরীফ হাসান
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ৮২ বার পড়া হয়েছে

বন্দরনগরীর বুকে এক ঐতিহাসিক জনপদ। চট্টগ্রামকে বলা হয় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। যুগে যুগে এই নগরী দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। আর সেই অর্থনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো খাতুনগঞ্জ। কর্ণফুলী নদীর তীরঘেঁষা এই জনপদ শুধু একটি বাজার নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ, উদ্যোক্তা সৃষ্টির ইতিহাস এবং শিল্পায়নের এক জীবন্ত দলিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশি-বিদেশি বণিক, নাবিক ও ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর থাকা খাতুনগঞ্জ একসময় দেশের ভোগ্যপণ্য বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী অবস্থান, নদীপথের সহজ যোগাযোগ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের কারণে খাতুনগঞ্জ দ্রুত বাণিজ্যিক গুরুত্ব অর্জন করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে তাদের পণ্যের বাজার তৈরি করতেন। ধীরে ধীরে এটি শুধু চট্টগ্রামের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

খাতুন বিবির নামে যে বাজারের নাম

খাতুনগঞ্জের নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট সওদাগর, শিক্ষিত সমাজপতি এবং ফারসি ভাষায় চট্টগ্রামের ইতিহাস রচয়িতা খান বাহাদুর শেখ মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ খাঁ এ অঞ্চলে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী খাতুন বিবির মালিকানাধীন জমিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটে।
ক্রমশ দোকানপাট, গুদাম ও ব্যবসায়িক স্থাপনা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এলাকাটি মানুষের কাছে ‘খাতুনবিবির গঞ্জ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সময়ের পরিক্রমায় সেই নামই সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘খাতুনগঞ্জ’ হয়ে যায়। আজও এই নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি।

কর্ণফুলীর জলপথে বাণিজ্যের বিস্তার

খাতুনগঞ্জের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থান। কর্ণফুলী নদী, চাক্তাই খাল এবং আশপাশের জলপথের মাধ্যমে সহজেই পণ্য পরিবহন করা যেত। চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা জাহাজ থেকে খাল ও নদীপথ ব্যবহার করে পণ্য পৌঁছে যেত খাতুনগঞ্জের গুদামে। তখনকার সময়ে এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর ও কম ব্যয়বহুল পরিবহন ব্যবস্থা।
ইতিহাসবিদদের মতে, অষ্টম ও নবম শতাব্দী থেকেই আরব বণিকরা চট্টগ্রামে আসতেন। পরে পর্তুগিজ, তুর্কি, ফরাসি এবং অন্যান্য বিদেশি ব্যবসায়ীরাও এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। সে সময় চট্টগ্রামকে ‘গেটওয়ে অব দ্য ইস্ট’ বা পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলা হতো। সেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল খাতুনগঞ্জ।
বহুজাতিক সংস্কৃতির এক মিলনমেলা
খাতুনগঞ্জ শুধু ব্যবসার কেন্দ্র ছিল না, এটি ছিল বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মিলনস্থল। আরব, তুর্কি, গুজরাটি, মারওয়ারি, বাঙালি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা এখানে একসঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে ওঠে এক অনন্য বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ।
চাক্তাই, আছাদগঞ্জ, কোরবানীগঞ্জ, রামজয় মহাজন লেন ও বক্সিরহাটের মতো এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্কৃতি। ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্র হিসেবেও খাতুনগঞ্জ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্বাধীনতার আগে ও পরে ব্যবসার পালাবদল

পাকিস্তান আমলে আমদানি বাণিজ্যে অবাঙালি ব্যবসায়ীদের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। গুজরাট ও মুম্বাইয়ের ব্যবসায়ীরা সরাসরি আমদানির সুযোগ পেতেন এবং বাজারে তাদের শক্ত অবস্থান ছিল। স্থানীয় বাঙালি ব্যবসায়ীরা মূলত তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করতেন।
তবে স্বাধীনতার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, এলসি খোলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ার ফলে বাঙালি ব্যবসায়ীরা সরাসরি আমদানিতে যুক্ত হতে শুরু করেন। আশির দশকে এসে স্থানীয় উদ্যোক্তারা খাতুনগঞ্জের ব্যবসার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং নতুন এক অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে।

স্বপ্নবাজ তরুণদের সাফল্যের গল্প

সত্তর ও আশির দশকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষিত তরুণেরা জীবিকার সন্ধানে খাতুনগঞ্জে আসেন। কেউ চাকরি করতে, কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করতে, আবার কেউ অল্প পুঁজি নিয়ে ভাগ্য বদলাতে এসেছিলেন। তাদের অনেকেরই ছিল না বড় কোনো পারিবারিক ব্যবসার পটভূমি।
কিন্তু কঠোর পরিশ্রম, সততা, দূরদর্শিতা এবং বাজার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। খাতুনগঞ্জ তাদের জন্য হয়ে ওঠে বাস্তব জীবনের এক ব্যবসায়িক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেই তারা শিখেছেন বাজারের ভাষা, পণ্যের হিসাব, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার কৌশল।

শিল্পসাম্রাজ্যের জন্মভূমি

বাংলাদেশের অনেক শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর যাত্রা শুরু হয়েছে খাতুনগঞ্জের ছোট্ট অফিস, গুদাম বা ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ক্ষুদ্র পরিসরের ব্যবসা থেকে শুরু করে তারা ধীরে ধীরে শিল্প খাতে বিনিয়োগ করে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কেডিএস গ্রুপ, পিএইচপি গ্রুপ, জিপিএইচ গ্রুপ, বিএসএম গ্রুপ, পারটেক্স গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, কেএসআরএম, আরএসআরএম, সানোয়ারা গ্রুপসহ বহু প্রতিষ্ঠানের বিকাশের পেছনে রয়েছে খাতুনগঞ্জের অবদান। এ কারণে অনেকেই খাতুনগঞ্জকে বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্মভূমি বলে অভিহিত করেন।

সোনালি দিনের খাতুনগঞ্জ

আশি ও নব্বইয়ের দশক ছিল খাতুনগঞ্জের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ট্রাক, গুদাম, নৌযান, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত পুরো এলাকা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন পণ্য কিনতে।
একসময় দেশের ভোগ্যপণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হতো এখান থেকে। চিনি, ডাল, ভোজ্যতেল, মসলা, গম, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অধিকাংশ পণ্যের পাইকারি বাজার ছিল খাতুনগঞ্জ। তখন এটি শুধু একটি বাজার নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো।
বদলে যাওয়া সময়ের বাস্তবতা
একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির উন্নয়ন, মহাসড়ক যোগাযোগের সম্প্রসারণ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন পাইকারি বাজার গড়ে ওঠার ফলে খাতুনগঞ্জের একক আধিপত্য কমে আসে। ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য শহর ও অঞ্চলে।
তবুও খাতুনগঞ্জ তার গুরুত্ব হারায়নি। এখনও এখানে হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গুদাম, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার লেনদেন এই এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে।

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার প্রতীক

খাতুনগঞ্জের দিকে তাকালে বোঝা যায়, একটি বাজার কীভাবে একটি শহরের অর্থনৈতিক চরিত্র বদলে দিতে পারে। কর্ণফুলীর তীরে যে বাণিজ্যযাত্রা শুরু হয়েছিল দেড় শতাব্দীরও বেশি আগে, তা আজও দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
এই খাতুনগঞ্জ বাংলাদেশের বাণিজ্য ইতিহাসের গৌরব, উদ্যোক্তা তৈরির পাঠশালা, শিল্পায়নের ভিত্তিভূমি এবং চট্টগ্রামের আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ইতিহাস লেখা হলে খাতুনগঞ্জের নাম সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2026 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102